নিজস্ব প্রতিবেদক
বুধবার সকাল সাড়ে নয়টা। প্রবর্তক মোড়ের মূল সড়কে তখনও কাদামাখা জলের দাগ। ফুটপাতের পাশে জমে আছে আবর্জনা মঙ্গলবারের বন্যার স্মৃতি বহন করছে। চায়ের দোকানে বসে পাশাপাশি কথা বলছেন কয়েকজন। একজন বললেন, সারাজীবন দেখলাম এই মোড়ে পানি জমে। কিন্তু গতকাল যা দেখলাম, এতটা আর কোনো দিন দেখিনি।
ঠিক তখনই একটি গাড়ি এসে থামল। নেমে এলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। পরনে সাধারণ পোশাক, মুখে ক্লান্তির ছাপ। চারদিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন একবার। তারপর হাঁটতে শুরু করলেন সড়ক ধরে, দেখতে লাগলেন ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন।
ঘটনার শুরু মঙ্গলবার দুপুর থেকে। আকাশ কালো করে নামে ভারি বৃষ্টি। প্রথম এক ঘণ্টাতেই শহরের নিম্নাঞ্চলে পানি জমতে শুরু করে। প্রবর্তক মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ-একের পর এক এলাকা তলিয়ে যেতে থাকে।
প্রবর্তক মোড়ের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম জানান, দুপুর ১২টার দিকে হঠাৎ দেখি রাস্তায় হাঁটু পানি। আধা ঘণ্টার মধ্যে সেটা কোমর ছাড়িয়ে গেল। বিকেলে গলা পর্যন্ত উঠে গেছে। বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বাসায় উঠতে পারিনি, পাড়ার লোকজন মিলে ধরে নিয়ে যায়।
কাতালগঞ্জ এলাকার গৃহিণী সালমা বেগম বলেন, রান্নাঘরে পানি ঢুকে গেছে। চুলা নষ্ট হয়ে গেছে। ফ্রিজের নিচের অংশ পানিতে ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা। শুধু ঘরবাড়ি নয়, রাস্তায় আটকে পড়েন শত শত মানুষ। অফিসফেরত যাত্রীরা যানবাহন ছেড়ে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। অনেকে পারেননি।
বিকেলের দিকে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে গিয়ে বেরিয়ে আসে আসল কারণ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) জানায়, নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের নির্মাণকাজের সুবিধার্থে তিনটি প্রধান খালে বসানো হয়েছিল একাধিক অস্থায়ী বাঁধ। উদ্দেশ্য ছিল নির্মাণস্থলে পানি না ঢুকলে কাজ নির্বিঘ্নে চালানো যাবে।
কিন্তু মঙ্গলবারের ভারি বৃষ্টিতে সেই বাঁধগুলোই হয়ে ওঠে মূল সমস্যা। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে গিয়ে খালগুলো উপচে পড়ে। সেই পানি ঢুকে পড়ে নগরের অলিগলিতে, বাড়ির আঙিনায়, দোকানপাটে। পরিস্থিতির নির্মম পরিহাস — যে প্রকল্প তৈরি হয়েছিল চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে, সেই প্রকল্পের বাঁধই এবার ডুবিয়ে দিল গোটা নগর।